|

Advertisement
×

বাংলা কিউআর থাকলে এজেন্ট বাতিল, শঙ্কায় বিকাশ এজেন্টরা

রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬   প্রিন্ট   ২২৯ বার পঠিত

বাংলা কিউআর থাকলে এজেন্ট বাতিল, শঙ্কায় বিকাশ এজেন্টরা

দেশজুড়ে ডিজিটাল লেনদেন বাড়ানোর উদ্যোগের মধ্যে ‘বাংলা কিউআর’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা কিউআর সুবিধা চালু হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিকাশ এজেন্টশিপ বাতিল করা হচ্ছে। এতে বিকাশের এজেন্ট ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলা কিউআর-এর অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বিকাশ এজেন্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল আর্থিক সেবা দিয়ে আসছেন। গ্রাহকদের টাকা জমা, উত্তোলন, বিল পরিশোধসহ নানা ধরনের লেনদেনে তাদের ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু বাংলা কিউআর ব্যবহারের কারণে যদি এজেন্টশিপ বাতিলের ঘটনা ঘটে, তাহলে বিনিয়োগ করা অর্থ, দোকান পরিচালনার খরচ এবং ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে তাদের অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হবে।

এজেন্টদের ভাষ্য, বর্তমানে মোবাইল আর্থিক সেবার বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক নগদ অর্থের ব্যবহার কমিয়ে ডিজিটাল ও আন্তঃলেনদেনযোগ্য পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে ‘বাংলা কিউআর’ চালুর ফলে একই কিউআর ব্যবস্থার মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক সেবার গ্রাহকদের লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এতে ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য ডিজিটাল লেনদেন আরও সহজ হওয়ার কথা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক এজেন্ট বলেন, ‘আমরা বছরের পর বছর ধরে গ্রাহকদের সেবা দিয়ে আসছি। এখন যদি বাংলা কিউআর থাকার কারণে বিকাশের এজেন্টশিপ বাতিল করা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব? এজেন্টদের জন্য পরিষ্কার নীতিমালা ও নিরাপত্তা দরকার।’ আরেক এজেন্টের অভিযোগ, এজেন্টশিপ বাতিলের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কারণ এবং আগাম ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। কোনো এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের শর্ত ভঙ্গ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। কিন্তু শুধু ‘বাংলা কিউআর’ ব্যবহারের কারণে এজেন্টশিপ বাতিল করা হচ্ছে কি না, সেটি পরিষ্কার হওয়া দরকার।

তবে সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, বাংলা কিউআর এবং বিকাশের এজেন্ট ব্যবসা মূলত একই ধরনের সেবা নয়। বাংলা কিউআর প্রধানত ডিজিটালভাবে পণ্য বা সেবার মূল্য পরিশোধের একটি ব্যবস্থা। অন্যদিকে মোবাইল আর্থিক সেবার এজেন্টরা নগদ টাকা জমা ও উত্তোলনসহ বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকেন। ফলে বাংলা কিউআর সম্প্রসারণের সঙ্গে এজেন্টদের ভূমিকা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার কথা নয়। বরং ডিজিটাল লেনদেন বাড়ার সঙ্গে এজেন্টদের ব্যবসার ধরনেও পরিবর্তন আসতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। নগদ টাকা লেনদেনের পাশাপাশি ডিজিটাল পেমেন্ট, বিল পরিশোধ, বিভিন্ন আর্থিক সেবা ও গ্রাহক সহায়তার ক্ষেত্রে এজেন্টরা নতুন সুযোগ পেতে পারেন।

কিন্তু ডিজিটাল অর্থনীতির এই রূপান্তরের সময় ছোট উদ্যোক্তা ও এজেন্টদের স্বার্থও বিবেচনায় নেওয়ার দাবি উঠছে। কারণ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন এলাকায় মোবাইল আর্থিক সেবা পৌঁছে দিতে এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বা ব্যাংক শাখা থেকে দূরে থাকা অনেক মানুষ এখনো দৈনন্দিন আর্থিক লেনদেনের জন্য এজেন্টদের ওপর নির্ভরশীল।

বাংলাদেশে মোবাইল ব্যাংকিং সেবায় বিকাশ, নগদ, রকেটসহ অনেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে বাংলা কিউআর চালু হওয়ার পর শুধু বিকাশ এজেন্টদেরই নিবন্ধন বাতিলের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিকাশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ফোনে ও ইমেইলে কয়েকদিন যোগাযোগ করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে স্বাধীনতা টাওয়ারে অবস্থিত তাদের প্রধান কার্যালয়ে প্রতিবেদক স্বশরীরে গেলেও মিটিংয়ের অজুহাত দেখিয়ে জনসংযোগ বিভাগের কেউ দেখা দেননি।

এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘বিকাশ মূলত মার্কেট দখলে রাখতেই এজেন্ট বাতিল করছে। কারণ ন্যূনতম লেনদেনে চার্জ ফ্রি হওয়ায় গ্রাহকরা বাংলা কিউআর ব্যবহার করছে, সেক্ষেত্রে বিকাশ তাদের গ্রাহক হারাচ্ছে বলে মনে করছে। যদিও বিকাশ বলেছে চার্জ ফ্রি হওয়ায় বাংলা কিউআর ব্যবহার করে গ্রাহকরা ক্যাশআউট করে যা কাম্য নয় কিন্তু বিকাশ লেনদেনে কোটি কোটি টাকাও তো অনলাইন জুয়ায় যাচ্ছে, সেখানে তো বিকাশ তাদের নীতি-নৈতিকতা দেখাচ্ছে না।’

সিপিডির সদ্য বিদায়ী নির্বাহী পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘ক্যাশলেস লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর খুব দারুণ কাজ করছে। দিনকে দিন এ কার্যক্রম আরও জনপ্রিয় ও জনবান্ধব হবে তাতে সন্দেহ নেই। দেশে আগে থেকেই বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং এ ধরনের ক্যাশলেস লেনদেন শুরু করেছে। এখন ঝামেলাবিহীন লেনদেনের ক্ষেত্রে বাংলা কিউআর অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে। সেজন্য অন্যান্য ক্যাশলেস লেনদেন প্রতিষ্ঠানকেও অবশ্যই সহযোগিতামূলক মনোভাবে চলতে হবে। তাহলেই ক্যাশলেস লেনদেনে দেশ এগিয়ে যাবে।’

ঢাকা, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, ফরিদপুরসহ কয়েক জেলার এজেন্টদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, বিকাশ ডিস্ট্রিবিউশন হাউজ থেকে মাঠ পর্যায়ে মৌখিক নির্দেশনা দিয়েছে বাংলা কিউআর-এ লেনদেন না করতে। নির্দেশনা অমান্য করলে তাদের সঙ্গে বিকাশ ব্যবসা করবে না বলেও জানানো হয়। যেসব বিকাশ এজেন্টরা বাংলা কিউআর রেখেছিল তাদের এজেন্ট বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু রকেট, নগদ বা অন্যান্য এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলো এমন বাধ্যবাধকতা দেয়নি। এজেন্টদের দাবি, বাংলা কিউআর ব্যবহারের কারণে কোনো এজেন্টশিপ বাতিল করা হয়ে থাকলে তার কারণ স্পষ্ট করতে হবে। একই সঙ্গে এজেন্টদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নির্দেশনা জারি করা প্রয়োজন—কোন পরিস্থিতিতে এজেন্টশিপ বাতিল হতে পারে, বাংলা কিউআর ব্যবহারের সঙ্গে এজেন্টশিপের সম্পর্ক কী এবং এ ক্ষেত্রে এজেন্টদের অধিকার ও দায়িত্ব কী।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ক্যাশলেস লেনদেনের ক্ষেত্রে বিশেষ করে ছোটখাটো লেনদেনে যেন নগদ অর্থ বহন বা লেনদেন না করে সর্বত্র মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেনের মাধ্যমে করা হয় সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক বাংলা কিউআর বাধ্যতামূলক করেছে ১ জুলাই থেকে। তবে ইতোমধ্যে আমরা অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পেয়েছি যে বিকাশ কর্তৃপক্ষ তাদের এজেন্টদের দোকানে বাংলা কিউআর থাকলে বিকাশ এজেন্টশিপ বাতিল করে দিচ্ছে। এ ধরনের অভিযোগ সঠিক নয় বলে আমরা মানতে চাই কারণ এমন ঠুনকো বিষয়ে বিকাশ এজেন্টশিপ বাতিল করে দেওয়ার অর্থ হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অমান্য করা তথা রাষ্ট্রীয় স্পিরিটকে বাধাগ্রস্ত করা। আশা করব বিকাশ কর্তৃপক্ষ অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

 

Facebook Comments Box

Posted ০৯:১২ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

bankbimaarthonity.com |

এ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক : মোহাম্মাদ মুনীরুজ্জামান
প্রকাশক : সায়মুন নাহার জিদনী
সম্পাদকীয় ও বাণিজ্যিক কার্যালয়

পিএইচপি টাওয়ার, ১০৭/২, কাকরাইল, ঢাকা-১০০০।

ফোন: নিউজরুম: ০১৭১৫-০৭৬৫৯০, ০১৮৪২-০১২১৫১ ফোন: ০২-৮৩০০৭৭৩-৫

ই-মেইল: bankbima1@gmail.com